প্রধানমন্ত্রীর সৌদি সফর ঘিরে শ্রমবাজারে নতুন আশার আলো
সৌদি আরব বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সহযোগী। ধর্মীয়, অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও জনশক্তি খাতে দুই দেশের সম্পর্ক অত্যন্ত দৃঢ়। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজারও সৌদি আরব, আর দেশের রেমিট্যান্স আয়ের বড় একটি অংশ আসে সেখানে কর্মরত প্রবাসীদের কাছ থেকে। এমন প্রেক্ষাপটে সৌদি বাদশার আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রীর সৌদি সফরকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বর্তমানে সৌদি আরবে প্রায় ৩০ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন। তারা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার পাশাপাশি সৌদি আরবের উন্নয়নেও ভূমিকা রাখছেন। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে নতুন বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সৌদি আরবে চাকরি পেয়েছেন ২ লাখ ১৪ হাজার ৫৭০ জন বাংলাদেশি। একই সময়ে সিঙ্গাপুরে গেছেন ৩৬ হাজার ৩০৭ জন এবং কাতারে ২৯ হাজার ৮৮ জন। দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও লাখো পরিবারের জীবিকার সঙ্গে এই খাত সরাসরি সম্পৃক্ত।
তবে বর্তমানে সৌদি শ্রমবাজার নানা সংকটে রয়েছে। অনেক বাংলাদেশি কর্মী আকামা জটিলতা, চাকরির অনিশ্চয়তা, বেতন না পাওয়া এবং নিয়োগকর্তাদের অবহেলার কারণে দুর্ভোগে আছেন। আগে প্রতিদিন পাঁচ থেকে ছয় হাজার কর্মীর ভিসা ইস্যু হলেও বর্তমানে সেই সংখ্যা অনেক কমে গেছে।
এদিকে বিএমইটি গত ১ জুলাই থেকে সৌদি গমনেচ্ছু কর্মীদের বহির্গমন ছাড়পত্রের জন্য চাহিদাপত্র (ডিমান্ড লেটার) বাধ্যতামূলক করায় নতুন জটিলতা তৈরি হয়েছে। এতে অনেক আবেদন আটকে আছে এবং অনেকের ভিসা ও মেডিকেলের মেয়াদ শেষ হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশে নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত ড. আবদুল্লাহ জাফের এইচ. বিন আবিয়াহ বলেছেন, আগামী পাঁচ বছর বাংলাদেশ-সৌদি অর্থনৈতিক সম্পর্কে একটি নতুন অধ্যায় শুরু হতে পারে। শ্রমশক্তির পাশাপাশি কৌশলগত বিনিয়োগ, শিল্প সহযোগিতা ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রেও দুই দেশ এগিয়ে যেতে চায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সৌদি সফরে শ্রমিকদের আকামা, বেতন, নিরাপত্তা এবং নতুন শ্রমচুক্তির বিষয়গুলো গুরুত্ব পেলে উভয় দেশের জন্যই ইতিবাচক ফল আসতে পারে। এতে শ্রমবাজার আরও গতিশীল হবে এবং বাংলাদেশি কর্মীদের অধিকারও আরও সুরক্ষিত হবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি, বন্দর, অবকাঠামো, পর্যটন, কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বিমান চলাচলসহ বিভিন্ন খাতে সৌদি বিনিয়োগের বড় সম্ভাবনা রয়েছে। এসব খাতে যৌথ উদ্যোগ দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
অভিবাসন বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত পরিস্থিতি, নতুন ভিসা নীতি ও প্রশাসনিক জটিলতায় সাম্প্রতিক সময়ে সৌদিতে জনশক্তি রপ্তানি কমেছে। তাই প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে শুধু কূটনৈতিক সফর নয়, বরং শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, প্রবাসীদের অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে সৌদি রাষ্ট্রদূত জানান, ‘ভিশন ২০৩০’-এর আওতায় তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, পর্যটন, লজিস্টিকস, নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ নতুন খাতে বাংলাদেশি দক্ষ কর্মীদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে সৌদি আরব থেকে দেশে ২ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স এসেছে। দুই দেশের সরকার অভিবাসন ব্যয় কমানো, দক্ষতা উন্নয়ন এবং কর্মীদের অধিকার নিশ্চিত করতেও একসঙ্গে কাজ করছে।
প্রতি / এডি / শাআ













